New to site?


Login

Lost password? (X)

Already have an account?


Signup

(X)

আমাদের সেই রবি বাউল

আমাদের সেই রবি বাউল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বে বাউল সম্প্রদায়টিকে পূর্ব এবং পশ্চিমবাংলার মানুষ বোধহয়

কেবলই উদাসীন, খেপা, ছন্নছাড়া ভিক্ষুকের পর্যায় ফেলত । তাদের রচিত গান নিছক

পাগলামি বলে প্রতিভাত হ'ত । শুধুমাত্র প্রচারের অভাবে বাউল, চারণ

কবির রচিত গান যে কত উচ্চমার্গের লোকগান তা বুঝতে সমগ্র ভারতবাসীরও অনেক

সময় লেগেছিল । কিন্তু যুগযুগ ধরে এই খেপামি ও উদাসীনতার তাড়নায় এই সম্প্রদায়

বাংলা-সংস্কৃতির ভান্ডারকে যে কতখানি সমৃদ্ধ করে এসেছে তা আমরা এই ২০১১ সালে

এসে দাঁড়িয়ে খুব ভাল ভাবে উপলব্ধি করেছি । মুগ্ধ হয়েছি আমরা এদের রচনাশৈলীতে ।

ঋদ্ধ হয়েছে বাংলা গানের সংস্কৃতি। আধ্যাত্মিক এবং দেহতত্ত্বের ওপর এই লোকগান

ছড়িয়েছে মুখে মুখে ।

এই বাউলগানের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মূলে আছেন সেই মানুষটি যিনি লালমাটির দেশে

বাউলের গৈরিক বসনের রঙ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের রাঙা

ধূলায় । রবীন্দ্রনাথ বড় কাছ থেকে বাউলকে দেখেছিলন এবং বুঝেছিলেন তাদের

জীবনদর্শন । কোথায় যেন এক আত্মিক অনুভূতির সুরে তাঁর একতারায় বেঁধেছিলেন

বাউলের দোতারার সুর । বাউল সম্প্রদায় যেন বীরভূমের রাঙামাটিরই ফসল । একে চর্চা

করতে হবে , বুঝতে হবে এর দেহতত্ত্ব বাদ এদের রচিত লোকগান

মানুষকে দেবে লোকশিক্ষা । ঠিক যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাউল অঙ্গের গানের সুরে মানুষ

হারিয়ে গিয়ে উপলব্ধি করে বাউলগানে আধ্যাত্মবাদ এবং আত্মত্যাগের মূর্ছনা দেখে

প্রতিনিয়ত আমাদের এই প্রাণের কবিটির গানের ভাষায় কোথায় যেন মিল খুঁজে পাই ।

ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী হয়েও যে কবি প্রতিনিয়ত তাঁর গানের কথায় ব্যক্ত করেছেন সেই

আত্মত্যাগ ও ঈশ্বরের প্রতি আকুতি । তাঁর পূজা পর্যায়ের গানে ঈশ্বরের প্রতি আকুতি

উজাড় করে দিয়েছেন । তাই তাঁর জন্ম সার্ধ শতবর্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে বাউল কবি বলেও

এক একবার প্রণাম জানাই মনে মনে । বাউল যেমন তার গানের কথায় প্রকাশ করে প্রেম,

পূজা ও প্রকৃতির কত রঙ, গন্ধ এবং স্পর্শ আমাদের রবিঠাকুরও দেখেছিলেন সেই রঙ।

গীতবিতানের ক্যানভাস ভরে গেছিল তাঁর তুলির টানে । কোথায় যেন অন্তরের ছোঁয়া সেই

ছবিতে । যেমনটি আমরা পাই বাউলের সুরে

9831038066 [email protected]

আর কথায় । বাংলাদেশের বিখ্যাত বাউল রুদ্র মহম্মদ শহিদুল্লা যেমন লিখেছিলেন ; আমার

ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে ; রবীন্দ্রনাথ যেন সেই সুরে সুর

মিলিয়ে বলেছিলেন ; ;ধায় যেন মোর সকল ভালবাসা, প্রভু তোমার পানে, তোমার পানে,

তোমার পানে;

কিম্বা যখন বাউলকবি দ্বিজদাসের একতারায় বেজে উঠেছে সেই সুর ; তোমায়

হৃদমাঝারে রাখব ছেড়ে দেব না ; তখন রবিকবির ভাষায় বলে উঠতে ইচ্ছে হয়; আমি

হৃদয়েতে পথ কেটেছি, সেথায় চরণ পড়ে, অথবা ; আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে,

দেখতে আমি পাইনি তোমায়, দেখতে আমি পাইনি… “

এই ভাবে যত্রতত্র ভ্রাম্যমান ছন্নছাড়া বাউলদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ যেন নিঃশব্দে রেখে

গেছেন তাঁর গানের পূজার নৈবেদ্যখানি । রবীন্দ্রগান কোথাও হয়ে উঠেছে বাউল গান

অথবা লোকগানের মতই! বাউলকে কেউ কেউ বলেন তাঁরা The master singers of

যারা নিজেদের তৈরী যন্ত্রানুষঙ্গ নিয়ে গান গেয়ে বেড়ায় মনের আনন্দে । কিন্তু সেই গানের

প্রতিটি কথায় প্রকাশ ঘটে তাদের চিন্তাশীলতা আর জীবন দর্শন । কবিগুরুর গানেও আমরা

পাই ঠিক এমন উপনিষদের ভাষায় সেখানে গান শুধু গান নয়, যেন কবিতা ;বাচহ উবাচম্‌

আর তাই বুঝি রবীন্দ্রনাথ হয়েছিলেন সেই রাঙামাটির পথের পথিক আর লিখেছিলেন

গ্রামছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ, আমার মন ভুলায় রে…

যেখানে অজো বাউল গেয়ে বেড়ায় কবির গান

;আমার ভাঙাপথের রাঙাধূলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন…

হ্যাঁ, পড়েছেই তো সেই স্থানে কত বাউলের পদচিহ্ন। এবার কে আগে? বাউলগান না

রবি? বাউলের জন্য বিখ্যাত হল সেই বীরেদের ভূমি, রাঙ্গামাটির দেশ না কি রবীন্দ্রনাথের

হাতে গড়া শান্তিনিকেতনের জন্য বাউল গান এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল কালে কালে?

বাউলের কথা বলতে গেলে সর্বাগ্রে মনে পড়ে যায় লালন সাঁই এর কথা যিনি স্থান-কাল-

পাত্র ভেদে অমর বাউল কবি রূপে বিখ্যাত । ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম সম্পদ হল

লালনের গান । কবীরের মত দরিদ্র লালনের কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছিল না । ব্রিটিশ

শাসনাধীন ভারতের তথা বাংলার স্বাধীনতা অন্দোলন মুখী বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছিল

লালনের গানে ।

কথিত আছে যে রবীন্দ্রনাথ বাংলার কিম্বদন্তী বাউল লালন ফকিরের খোঁজ পেয়েছিলেন

তাঁর যৌবনে । এবং আকৃষ্ট হয়েছিলেন লালনের গানের কথায় । আপ্লুত হয়েছিলেন তার

কবিতার ভাবাদর্শে । কৃষক পরিবারের সন্তান এই দরিদ্র বাউলটি

রবীন্দ্রনাথের বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়; এর মত তাঁর গানের কথায় রেখে

গিয়েছিলেন সর্বজনীন দেহতত্ত্ব বাদ । প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আত্মার মুক্তি । তাই

রবীন্দ্রনাথও অকপটে স্বীকার করেছেন সমগ্র বাউল সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর

অপরিশোধিত ঋণের কথা । আমরা ধন্য হয়েছি তাঁর বাউল অঙ্গের গান শুনে । রবীন্দ্র

নাটকে পেয়েছি সেই বাউল চরিত্রটি যে শুদ্ধ, নির্মল চিত্তে উপলব্ধি করেছে তার মানব

সত্তাকে । কবি গেয়ে উঠেছেন

এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়.

রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন

One day I chanced to hear a song from a beggar belonging to the baul sect

of Bengal.. What struck me in this simple song was a religious expression

that was neither grossly concrete nor

metaphysical in its rarefied transcendentalism…

ইউরোপে বসবাসকালে ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত Hibbert Lecture এ

বাউল সম্পর্কে বলেছিলেন | তাঁর বিস্তারিত আলোচনা লিপিবদ্ধ করে ব‌ইয়ের আকারে

প্রকাশিত হয়েছিল যে ব‌ইয়ের নাম ;The Religion Of Man; [ NEW YORK, THE

MACMILLAN COMPANY 1931]

রবীন্দ্রনাথ এবং বাউলের আলোচনায় এসে যায় বৈষ্ণবধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং তন্ত্র সাহিত্যের

বিদগ্ধ লেখক শশীভূষণ দাসগুপ্তের কথা যিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ;An Introduction to

Tantric Buddhism; এ বলেছেন We, for the past few

decades, have been influenced by the ideas propagated by the poet Tagore

in his poems and writings, and also by the writings and speeches of his close

associate Pandit Khitimohan Sen, for them baul represents more a spirit of

unconventional approach to divinity through anassumed love and piety than

any precise religious call.

নদীয়ার বাউল সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে কবিগুরুর সাথে লালন ফকিরের সাক্ষাত হয়েছিল ।

পরবর্তীকালে বাউল গগন হরকরা রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে গিয়েছিলেন

।এবং বাউলের মনে তখন থেকেই রবীন্দ্রগানের প্রভাব পড়তে

থাকে । এই বাউল-ঠাকুর বন্ধনের রেশ কিন্তু থেকে গেছে শান্তিনিকেতনে আজো

পৌষমেলা প্রাঙ্গণে উড়তে দেখি বাউলের গৈরিক উত্তরীয় । বাউলের একতারায় বাজতে

থাকে বাউলগানের পাশাপাশি রবীন্দ্রগান । আর যার জন্যই বুঝি

রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ এবং নন্দলাল বসুর আঁকা ফ্রেসকো, মিউরাল এবং স্কাল্পচারে

স্থান পায় বাউল অনুষঙ্গ। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার পাশাপাশি বীরভূমের কেঁদুলিতে

জয়দেবের জন্মস্থানে কেঁদুলির মেলাতেও বাউল আড্ডা, বাউল গান মাতিয়ে রাখে মেলা

প্রাঙ্গণ । আজকালের বাউল রা অতিখাসা রবীন্দ্রগানের চর্চা করছেন আর সেখানেই

কোথায় যেন রবীন্দ্র সঙ্গীত আর বাউলগান মিলে মিশে এক হয়ে যায় তখন ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই বিখ্যাত ইংরেজী গ্রন্থ ;The Religion of Man এ তিনি লিখেছেন

;Where shall I meet him, the man of my heart?

He is lost to me and I seek him wandering from land to land

I am listless for that moonrise beauty which is to light my life,

which I long to see in the full vision in gladness of heart ;[pg 524]

এটি বাউল গগন হরকরা রচিত বিখ্যাত গান

;আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যেরে..;

আর রবি কবি সেই রূপ-রস-গন্ধ-স্বাদ নিয়েই বুঝি লিখেছিলেন

;আমি তারেই খুঁজে বেড়াই, যে রয় মনে আমার মনে..;

এভাবে কবির অনেক গানের কথায় এবং সুরে আমরা দেখতে পাই বাউলগানের সেই মাটির

ছোঁয়া এবং মেনে নিতে বাধ্য হই যে রবীন্দ্রনাথ কতখানি বাউলের দ্বারা প্রভাবিত

হয়েছিলেন ।

রবীন্দ্রনাথের ;ডাকঘর; নাটকটি মঞ্চস্থ হবার ঠিক পূর্ব মূহুর্ত্তে তিনি মনে করেছিলেন একটি

গানের প্রসঙ্গ যেটি ডাকঘরের ;অমল; চরিত্রটিকে একটি সার্থক রূপ দিতে পারে বলে তাঁর

মনে হয় । আবার সেই কোন এক কালের স্রোতে ভেসে

যাওয়া নথিহীন বাউলের গান;

দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা ,

তারে ধরি ধরি মনে করি ধরতে গিয়ে আর পেলেম না …;

এর অনুকরণে অতি অনায়াসেই সৃষ্টির সাবলীলতায় তিনি রচনা করেছিলেন সেই গান

;ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে, ও বন্ধু আমার !

না পেয়ে তোমার দেখা একা একা, দিন যে আমার কাটে না রে …;

সেই এক অনুরণন, এক মূর্ছনা আবারো ভাবিয়ে তোলে আমাদের।

আরো একটি রবীন্দ্র সঙ্গীতে আমরা পাই লালনের দেহ তত্ত্ববাদের স্পষ্ট ইশারা । বোধ করি

লালন ফকিরের দেহ সাধনা এবং মন সাধনায় অনুপ্রাণিত হয়েই কবি লিখেছিলেন এই গান

খানি ।

;আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে,

তাই হেরি তায় সকল খানে

আছে সে নয়নতারায়,

9831038066 [email protected]

আলোক ধারায় তাই না হারায়

ওগো তাই দেখি তায় যেথায় সেথায়

তাকাই আমি যে দিক পানে …

যার ইংরেজী অনুবাদটি হল

The man of my heart dwells inside me.

Everywhere I look, it is he.

In my every sight, in the sparkle of light

Oh, I can never lose him —

Here, there and everywhere,

Wherever I turn, he is right there!

যে গানের মধ্যে বাউলের মানব সত্ত্বায় তার মনের মানুষের চেহারাটি একদম মিলে গেছে

রবীন্দ্র চিন্তায় তার প্রানের মানুষটির সাথে ।

রবীন্দ্রনাথের ; The Religion of Man ; ব‌ইটির অ্যাপেন্ডিক্সের একটি অধ্যায় রয়েছে যার

নাম ;The Baul Singers of Bengal; । কবির হিবার্ট লেকচারে বাউল সম্বন্ধে এই বিস্তৃত

আলোচনা করেছিলেন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ক্ষিতিমোহন সেন এবং কবি এই গ্রন্থে তাঁর

প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং ঐ পরিচ্ছেদ গুলি তাঁর গ্রন্থে স্থান ও পেয়েছে ।

ক্ষিতিমোহন সেনের লেখায় আবার উঠে আসে সেই সূক্ষ দেহ বাদ এবং সহজ মনের তত্ত্ব

। এক জায়গায় তিনি বলছেন বাউলের গানের ভাষায় :

The Baul sings:

Ah where am I to find him, the man of my heart?

Alas, since I lost him, I wander in search of Him.

Thro' lands near and far.

আলোচনার সব শেষে অধ্যাপক ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন চন্ডীদাসের সেই বিখ্যাত উক্তি

;সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই; । কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাতড়ে বেড়িয়েছেন এই

অমোঘ সত্যকে আর তাই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের

ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক এডওয়ার্ড. সি. ডিমক রবীন্দ্রনাথকে বলেছেন;The Greatest Of

The Bauls Of Bengal; !

Rupsha Bhadra

Student at Jadavpur University
A student of International Relations, Jadavpur University she takes active interest in literature, music, painting and more. Fiercely passionate about people she loves, she doesn't share her chocolate.

Latest posts by Rupsha Bhadra (see all)

Tags:

    A student of International Relations, Jadavpur University she takes active interest in literature, music, painting and more. Fiercely passionate about people she loves, she doesn't share her chocolate.
    Related Posts